Header Ads

Header ADS

মুহাম্মাদ

 

মুহাম্মাদ


মুহাম্মাদ[টীকা ১] (আরবিمُحَمَّدপ্রতিবর্ণীকৃত: মুহাম্মাদ; আনুমানিক ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ – ৮ জুন ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ)[], পূর্ণ সম্মানসূচক নাম হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (ﷺ), আরবের একজন ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতা এবং ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন।[] ইসলামি মতবাদ অনুযায়ী, তিনি আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত একজন নবী যিনি আদমইব্রাহিমমুসাঈসা এবং অন্যান্য নবীদের একত্ববাদী শিক্ষাকে প্রচার ও দৃঢ় করতে এসেছিলেন।[][][] মুসলিমগণ বিশ্বাস করেন যে, মুহাম্মাদ ছিলেন আল্লাহ প্রেরিত শেষ নবী ও রাসুল এবং কুরআন ও মুহাম্মাদের জীবনাদর্শ (সুন্নাহ) হলো ইসলাম ধর্মের মূলভিত্তি।

মুহাম্মাদ আনুমানিক ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।[] তার পিতার নাম আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং মাতার নাম আমিনা বিনতে ওহাব। মুহাম্মাদের জন্মের পূর্বেই তার পিতা আব্দুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। মুহাম্মাদ এর ছয় বছর বয়সে তার মাতা আমিনা মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তিনি এতিম হয়ে যান।[][] এতিম মুহাম্মাদ তার দাদা আব্দুল মুত্তালিব এবং পরে তার চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হন।[১০] পরবর্তী জীবনে, তিনি মাঝে মাঝে নূর পর্বতের হেরা নামক গুহায় রাত কাটাতেন এবং একাগ্রচিত্তে ধ্যানমগ্ন থাকতেন।

আনুমানিক ৬১০ খ্রিস্টাব্দে, হেরা গুহায় অবস্থানকালে জিবরাঈল নামক ফেরেশতা মুহাম্মাদ এর কাছে আসেন[] এবং তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহি বা বাণী পৌঁছে দেন।[১১] তখন মুহাম্মাদ এর বয়স ছিল ৪০ বছর। ৬১৩ খ্রিস্টাব্দে[১১] মুহাম্মাদ সর্বসমক্ষে এসব বাণী প্রচার করা শুরু করেন।[১২] তিনি ঘোষণা করেন, "আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়", আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ (ইসলাম) হলো জীবনের একমাত্র সঠিক পথ (দ্বীন)[১৩] এবং ইসলামের অন্যান্য নবীদের মতোই তিনি আল্লাহর একজন নবী ও রাসূল।"[][১৪][১৫]

মুহাম্মাদ এর অনুসারীর সংখ্যা প্রথমদিকে খুবই কম ছিল। মক্কার বহুঈশ্বরবাদী কুরাইশদের পক্ষ থেকে তিনি ১৩ বছর ধরে নির্যাতনের শিকার হন। ক্রমাগত নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে তার কিছু অনুসারী আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) চলে যান। পরবর্তীতে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ও তার অনুসারীরা মক্কা থেকে মদিনায় (তৎকালীন নাম ইয়াসরিব) চলে যান। এই ঘটনাকে ‘হিজরত’ বলা হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে ইসলামি বর্ষপঞ্জি বা হিজরি সনের সূচনা হয়। মদিনায় মুহাম্মাদ সকল গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং একটি চুক্তির মাধ্যমে ‘মদিনার সনদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে, মক্কার গোত্রগুলোর সাথে আট বছরব্যাপী আন্তঃবৈরিতার পর, মুহাম্মাদ দশ হাজার মুসলিম সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে মক্কা শহরের দিকে অগ্রসর হন। তিনি প্রায় বিনা রক্তপাতেই মক্কা নগরী জয় করেন। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার কয়েক মাস পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর সময়, আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়।[১৬][১৭]

মুহাম্মাদ তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আল্লাহর কাছ থেকে যে বাণীগুলো লাভ করেন সেগুলো কুরআনের আয়াত হিসেবে পরিগণিত হয়। মুসলিমদের নিকট এটি আল্লাহর অবিকৃত বাণী হিসেবে পরিগণিত হয়, যার ওপর ভিত্তি করে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠিত। কুরআনের পাশাপাশি মুহাম্মাদ এর নিজস্ব জীবনাদর্শ ও নির্দেশনা (সুন্নাহ), যা হাদিস ও সীরাহ গ্রন্থে বর্ণিত আছে, সেগুলোকেও ইসলামি আইনের উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়।


নাম ও উপাধি

মুসলিম সমাজে মুহাম্মাদকে অসংখ্য নাম ও উপাধি দেওয়া হয়েছে।[১৮] এই নামগুলোকে কুরআনে প্রদত্ত নাম, হাদিসে বর্ণিত নাম, পবিত্র গ্রন্থে বর্ণিত নাম এবং আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের (আসমাউল হুসনা) সাথে মিল আছে এমন নাম - এইভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। উসমানীয় পণ্ডিত মুস্তাকিমজাদে সুলাইমান সাদেদ্দিন (১৭১৯-১৭৮৮) তার "মিরাতুস সাফা ফি নুহবেতি এসমাইল মোস্তফা" গ্রন্থে মুহাম্মাদ এর ৯৯টি নাম ব্যাখ্যা করেছেন।[১৯][২০]

তার পুরো নাম হলো "আবুল কাসিম মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম ইবনে আব্দ মানাফ আল কুরাইশি" (আরবি: محمد بن عبد الله بن عبد المطلب بن هاشم بن عبد مناف القرشي) অথবা সংক্ষেপে "আবুল কাসিম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব আল হাশিমি"। এই নামটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় "কুরাইশ গোত্রের আব্দুল মানাফের পুত্র হাশিম, হাশিমের পুত্র আব্দুল মুত্তালিব, আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র আব্দুল্লাহ এবং আব্দুল্লাহর পুত্র ও কাসিমের পিতা মুহাম্মাদ"।[২১] এছাড়াও বলা হয়ে থাকে, সমাজে তিনি "আল-আমিন" (বিশ্বস্ত ব্যক্তি, সত্যবাদী ব্যক্তি) উপাধি লাভ করেছিলেন এবং 'মুহাম্মাদুল আমিন' নামেও পরিচিত ছিলেন।[২১]

মুহাম্মাদ নামটি আরবি ভাষার "হামদ" শব্দ থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ "প্রশংসা"।[২২] "মুহাম্মাদ" অর্থ "প্রশংসিত", "যিনি প্রশংসা পান", "যিনি প্রশংসার যোগ্য"।[২১] মুসলিমরা তাকে "মুস্তাফা", "মাহমুদ" এবং "আহমদ" নামেও ডেকে থাকেন। "মুস্তাফা" অর্থ "নির্বাচিত" এবং "আহমদ" অর্থ "অধিক প্রশংসিত"। তার কুনিয়া (পিতৃত্বসূচক নাম) "আবু'ল-কাসিম", যার অর্থ "কাসিমের পিতা"। আরব সমাজে কুনিয়া প্রথম পুত্রের নামের উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়।[২৩] মুহাম্মাদ নিজেকে "আবু'ল-বানাত" (কন্যাদের পিতা) হিসেবেও অভিহিত করেছিলেন কারণ তার সাত সন্তানের মধ্যে চারজনই ছিল কন্যা।

কুরআন অনুসারে, মুহাম্মাদ এর আগমন পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থ যেমন তাওরাত এবং ইঞ্জিল-এ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিসে মুহাম্মাদ বলেছেন, "কুরআনে আমার নাম মুহাম্মাদ, ইঞ্জিলে আহমদ এবং তাওরাতে আহয়েদ।"[২৪][২৫][২৬]

জার্মান প্রাচ্যবিদ (Orientalist) ভলকার পপ একটি মতবাদ প্রস্তাব করেছেন যে, "মুহাম্মাদ" এবং চতুর্থ খলিফার নাম "আলি" (যার অর্থ মহান) প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তিবিশেষের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; বরং এগুলো উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।[২৭]

কুরআন

মুহাম্মাদ নামের বাংলা অর্থ "প্রশংসনীয়" এবং এই নামটি পবিত্র কুরআন শরীফে মোট চারবার এসেছে।[২৮] পবিত্র কুরআনে মুহাম্মাদকে বিভিন্ন উপাধির মাধ্যমে সম্বোধন করা হয়েছে। উপাধিগুলো হলো- আহমাদ, [কুরআন ৬১:০৬] নবী, রাসূল, আল্লাহর বান্দা ('আবদ'), ঘোষক ('বশির'),[কুরআন ২:১১৯] সাক্ষী ('শহীদ'),[কুরআন ৩৩:৪৫] সুসংবাদদাতা ('মুবাশ্শীর'), সতর্ককারী ('নাজির'),[কুরআন ১১:২] স্মরণকারী ('মুজাক্কির'),[কুরআন ৮৮:২১] সৃষ্টিকর্তার বার্তাবাহক ('দাঈ')[কুরআন ১২:১০৮] আলোকিত ব্যক্তিত্ব ('নূর'),[কুরআন ০৫:১৫] এবং আলো-প্রদানকারী বাতি ('সিরাজ মুনির')।[কুরআন ৩৩:৪৬]

কুরআন হলো ইসলামের মূল এবং প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থ। মুসলিমরা বিশ্বাস করেন যে, এটি আল্লাহর বাণী যা প্রধান ফেরেশতা জিব্রাইলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ২৩ বছর ধরে মুহাম্মাদের নিকট প্রত্যাদেশ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে।[২৯][৩০][৩১] কুরআন মূলত একক "আল্লাহর রাসূল" কে সম্বোধন করেছেন, যাকে বেশ কয়েকটি আয়াতে মুহাম্মাদ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরাইশদের দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার পরে মদিনায় তার অনুসারীদের বসতি স্থাপনের কথাও কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বদরের যুদ্ধের মতো মুসলিমদের সামরিক বিজয় অভিযানেরও সংক্ষিপ্ত উল্লেখ রয়েছে।[৩২]

তবে, কুরআন মুহাম্মাদের জীবনীসংক্রান্ত কালানুক্রমের জন্য সামান্যই তথ্য প্রদান করে; কুরআনের বেশিরভাগ আয়াত উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বা সময়রেখা সরবরাহ করে না।[৩৩][৩৪] কুরআনের মধ্যে মুহাম্মাদের বেশিরভাগ সাহাবির নামও উল্লেখ নেই, ফলে সংক্ষিপ্ত জীবনী রচনার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় না। কুরআনকে মুহাম্মাদের সমসাময়িক বলে বিশ্বাস করা হয়। বার্মিংহাম কুরআন পাণ্ডুলিপি রেডিওকার্বন পদ্ধতিতে তার জীবদ্দশায় লেখা বলে প্রমাণিত হয়েছে, যা কুরআনের উৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এমন পশ্চিমা পুনর্বিবেচনাবাদী তত্ত্বগুলোর বিরোধিতা করে।[৩৫][৩৬]

প্রারম্ভিক জীবনী

মুহাম্মাদের জীবন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস পাওয়া যায় হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে (খ্রিস্টীয় অষ্টম ও নবম শতাব্দীর আশেপাশে) লেখকদের ঐতিহাসিক রচনাবলীতে।[৩৭] এর মধ্যে রয়েছে নবী মুহাম্মাদের প্রথাগত মুসলিম জীবনীগ্রন্থসমূহ, যেগুলো তার জীবন সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য সরবরাহ করে।[৩৮]

প্রাচীনতম লিখিত সীরাহ (মুহাম্মাদের জীবনী এবং তার কথিত উদ্ধৃতি) হলো ইবনে ইসহাকের সীরাতে রাসূলুল্লাহ যা লেখা হয় আনুমানিক খ্রিস্টীয় ৭৬৭ সালে (১৫০ হিজরি)। যদিও মূল রচনাটি হারিয়ে গেছে, ইবনে হিশামের রচনায় ব্যাপক উদ্ধৃতি হিসেবে এবং আল-তাবারির রচনায় কিছুটা কম পরিমাণে এই সীরাহটি টিকে আছে।[৩৯][৪০] তবে ইবনে হিশাম মুহাম্মাদের জীবনী গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন যে তিনি ইবনে ইসহাকের জীবনী থেকে এমন বিষয়গুলো বাদ দিয়েছেন যা "নির্দিষ্ট কিছু লোককে বিচলিত করবে"।[৪১] আরেকটি প্রাথমিক ঐতিহাসিক উৎস হলো আল-ওয়াকিদি (মৃত্যু ২০৭ হিজরী) কর্তৃক মুহাম্মাদের বিভিন্ন অভিযানের ইতিহাস এবং ওয়াকিদির শিষ্য ইবনে সা'দ আল-বাগদাদির (মৃত্যু ২৩০ হিজরী) রচনা[৩৭]

অনেক পণ্ডিত এই প্রাথমিক জীবনীগুলোকে সঠিক বলে মেনে নেন, যদিও তাদের নির্ভুলতা যাচাই করা যায় না।[৩৯] সাম্প্রতিক গবেষণায় পণ্ডিতদেরকে আইনগত বিষয় এবং সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাসম্পর্কিত রেওয়ায়াতগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে পরিচালিত করেছে। আইনগত ক্ষেত্রে, রেওয়ায়াতসমূহ উদ্ভাবনের শিকার হতে পারত; অন্যদিকে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো, ব্যতিক্রমী কয়েকটি ক্ষেত্র বাদে, হয়তো কেবল "প্রবণতামূলক রূপদানের" শিকার হয়েছিল।[৪২]

হাদিস

ইসলামী অনুশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো হাদিস সংকলন, যেখানে নবী মুহাম্মাদ এর মৌখিক এবং আচরণগত শিক্ষা ও রীতিনীতির বিবরণ পাওয়া যায়। ইমাম বুখারীমুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজমুহাম্মাদ ইবনে ঈসা আত-তিরমিজিইমাম নাসাইআবু দাউদইবনে মাজাহমালিক ইবনে আনাসআল-দারাকুতনি সহ বেশ কিছু ইসলামী পণ্ডিতগণ নবী মুহাম্মাদের ইন্তেকালের কয়েক প্রজন্ম পরে হাদিসগুলো সংকলন করেছিলেন।[৪৩][৪৪]

কিছু পশ্চিমা পণ্ডিত হাদিস সংগ্রহগুলোকে নির্ভুল ঐতিহাসিক উৎস হিসাবে বিবেচনা করতে সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। উইলফার্ড মেডেলাং এর মতো পন্ডিতরা পরবর্তীকালে সংকলিত বর্ণনাগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেন না, বরং এইগুলোকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এবং সেই সময়কার ঘটনা ও ব্যক্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে বিচার করেন।[৪৫] অন্যদিকে, মুসলিম পন্ডিতরা সাধারণত জীবনীমূলক সাহিত্যের পরিবর্তে হাদীস সংকলনগুলোর উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করেন। এর কারণ, হাদিসগুলোতে একটি ঐতিহ্যবাহী সনদ (পরম্পরা) বজায় থাকে। জীবনীমূলক সাহিত্যে এমন সনদের অভাব থাকায় মুসলিম পন্ডিতদের কাছে সেগুলো অপ্রমাণিত বলে বিবেচিত হয়।[৪৬]

মৌখিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

মুহাম্মাদ ও তার সমসাময়িকদের জীবন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের প্রধান উৎস হলো হাদিস ও সীরাত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল মুহাম্মাদের ওফাতের ১৫০-২০০ বছর পরে, যখন তার জীবনের ঘটনাগুলো মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিলো।[৪৭] এই দীর্ঘ মৌখিক ঐতিহ্যের কারণে, হাদিস ও সীরাতে বর্ণিত ঘটনাগুলোর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।[৪৮][৪৯] কিছু তথ্য বাইরের উৎস দ্বারা সমর্থিত না হলেও, অনেকের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যও লক্ষ্য করা যায়। সময়ের সাথে সাথে, মৌখিকভাবে প্রচলিত ঘটনাগুলো পরিবর্তিত হয়েছে এবং কয়েক প্রজন্ম পরে ঐতিহাসিক সত্য থেকে বহু দূরে সরে গেছে।[৪৯][৫০][৫১] অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, হাদিস ও সীরাতের মতো প্রাথমিক উৎসগুলোতে[৫২][৫৩] মুহাম্মাদের জীবনের সাথে সম্পর্কহীন গল্পগুলো পরিবর্তনের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়েছে।[৫২][৫৪] ফিলিস্তিনি অধ্যাপক সামি আলদীব এই বিষয়ে একটি উল্লেখযোগ্য মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন যে, খায়বারের যুদ্ধ এবং বনু কুরাইজা অবরোধ এর মতো ঘটনাগুলো মুহাম্মাদের জীবনে ঘটেছিল বলে দাবি করা হয়, কিন্তু ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থে এই ঘটনাগুলোর বর্ণনা আছে, যেখানে বলা হয়েছে যে ইহুদিরা ইহুদি-নয় এমন লোকদের হত্যা করেছিল।[৫৫]

হাদিস ও সীরাতের মতো ঐতিহ্যবাহী রচনা ছাড়াও ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস, এর উত্থানের সময়কাল এবং এর উৎপত্তি ও বিস্তারের ভৌগলিক অবস্থান বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চলছে। ঐতিহ্যবাহী বর্ণনা যেখানে মক্কাকে কেন্দ্র করে, সেখানে "পেত্রা" সহ বিকল্প ভৌগলিক অবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে এমন নতুন তত্ত্ব ও দাবি উঠে এসেছে।[৫৬] এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পেত্রা, পেত্রার উত্তরে অবস্থিত একটি অঞ্চল, কুফা এবং হিরা (দক্ষিণ ইরাক) অঞ্চল। বাইজেন্টাইন ক্রনিকল, খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের রেকর্ড, মুদ্রা, আব্বাসীয় যুগে হাদিস ও ইতিহাসবিদদের লেখা ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস, হিরা ও মদিনার মতো প্রাচীন শহরের নাম এবং অন্যান্য প্রমাণ মুহাম্মাদ ও প্রাথমিক ইসলামের ভৌগলিক অবস্থানকে দক্ষিণ ইরাকের সাথে যুক্ত করে। এছাড়াও, মুহাম্মাদের জীবনী একাধিক ব্যক্তির জীবনীর সংমিশ্রণ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।[৫৭][৫৮][৫৯][৬০]

প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার

ইসলামী ভূগোলে লুকানো, সময়ে সময়ে প্রদর্শিত ও প্রচারিত এবং মুহাম্মাদ এর জীবনী সম্পর্কিত নথি, যা রেডিওকার্বন ডেটিং এবং জিনগত বংশতালিকা পরীক্ষার মতো পদ্ধতি দ্বারা প্রমাণিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।[৬১] এর মধ্যে রয়েছে মদিনার সনদমুহাম্মাদের আশতীনামা এবং তার সময়ের রাষ্ট্রপ্রধান ও গভর্নরদের কাছে লিখিত বলে মনে করা চিঠিপত্র[৬১] এছাড়াও চুল, দাড়ি, জামা, জুতা ইত্যাদি জিনিসপত্রও এই আবিষ্কারের অন্তর্গত।

মুহাম্মাদ ও তার সমসাময়িকদের জীবন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের প্রধান উৎস হলো হাদিস ও সীরাত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল মুহাম্মাদের ওফাতের ১৫০-২০০ বছর পরে, যখন তার জীবনের ঘটনাগুলো মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিলো।[৪৭] এই দীর্ঘ মৌখিক ঐতিহ্যের কারণে, হাদিস ও সীরাতে বর্ণিত ঘটনাগুলোর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।[৪৮][৪৯] কিছু তথ্য বাইরের উৎস দ্বারা সমর্থিত না হলেও, অনেকের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যও লক্ষ্য করা যায়। সময়ের সাথে সাথে, মৌখিকভাবে প্রচলিত ঘটনাগুলো পরিবর্তিত হয়েছে এবং কয়েক প্রজন্ম পরে ঐতিহাসিক সত্য থেকে বহু দূরে সরে গেছে।[৪৯][৫০][৫১] অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, হাদিস ও সীরাতের মতো প্রাথমিক উৎসগুলোতে[৫২][৫৩] মুহাম্মাদের জীবনের সাথে সম্পর্কহীন গল্পগুলো পরিবর্তনের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়েছে।[৫২][৫৪] ফিলিস্তিনি অধ্যাপক সামি আলদীব এই বিষয়ে একটি উল্লেখযোগ্য মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন যে, খায়বারের যুদ্ধ এবং বনু কুরাইজা অবরোধ এর মতো ঘটনাগুলো মুহাম্মাদের জীবনে ঘটেছিল বলে দাবি করা হয়, কিন্তু ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থে এই ঘটনাগুলোর বর্ণনা আছে, যেখানে বলা হয়েছে যে ইহুদিরা ইহুদি-নয় এমন লোকদের হত্যা করেছিল।[৫৫]

হাদিস ও সীরাতের মতো ঐতিহ্যবাহী রচনা ছাড়াও ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস, এর উত্থানের সময়কাল এবং এর উৎপত্তি ও বিস্তারের ভৌগলিক অবস্থান বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চলছে। ঐতিহ্যবাহী বর্ণনা যেখানে মক্কাকে কেন্দ্র করে, সেখানে "পেত্রা" সহ বিকল্প ভৌগলিক অবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে এমন নতুন তত্ত্ব ও দাবি উঠে এসেছে।[৫৬] এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পেত্রা, পেত্রার উত্তরে অবস্থিত একটি অঞ্চল, কুফা এবং হিরা (দক্ষিণ ইরাক) অঞ্চল। বাইজেন্টাইন ক্রনিকল, খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের রেকর্ড, মুদ্রা, আব্বাসীয় যুগে হাদিস ও ইতিহাসবিদদের লেখা ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস, হিরা ও মদিনার মতো প্রাচীন শহরের নাম এবং অন্যান্য প্রমাণ মুহাম্মাদ ও প্রাথমিক ইসলামের ভৌগলিক অবস্থানকে দক্ষিণ ইরাকের সাথে যুক্ত করে। এছাড়াও, মুহাম্মাদের জীবনী একাধিক ব্যক্তির জীবনীর সংমিশ্রণ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।[৫৭][৫৮][৫৯][৬০]

ঐতিহাসিকতা

ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস, বিশেষ করে মুহাম্মাদ এর জীবন ও কর্ম, কেবলমাত্র মুসলিম উৎস থেকেই জানা যায় না। ৬৩৩ সালের পরে লেখা বাইরের উৎস, যেমন: ইহুদি ও খ্রিস্টানদের লেখা গ্রিক, সিরীয়, আর্মেনীয় এবং হিব্রু ভাষার লেখায়ও এই সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এই বাইরের উৎসগুলো, বিশেষ করে কালক্রম এবং মুহাম্মাদ এর ইহুদি ও ফিলিস্তিনের প্রতি মনোভাব সম্পর্কে, মুসলিম উৎসগুলোর তথ্যের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য প্রদর্শন করে।[৬২] উল্লেখযোগ্য যে, মুহাম্মাদ এর নবী হিসেবে খ্যাতির পূর্ববর্তী জীবন সম্পর্কে বাইজেন্টাইন বা সিরীয় কোনো উৎসে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না।[৬৩] ইংরেজ ইতিহাসবিদ সেবাস্টিয়ান পল ব্রক এর গবেষণা অনুসারে, সিরীয় ও বাইজেন্টাইন উৎসগুলোতে "নবী" উপাধি মুহাম্মাদ এর জন্য তেমন ব্যবহৃত হয়নি, "রাসুল" তো আরও কম।[৬৪] বরং, তাকে "প্রথম আরব রাজা" হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সময়কালের সিরীয় উৎসগুলো প্রাথমিক ইসলামী বিজয়কে "মুসলিম বিজয়" হিসেবে চিহ্নিত না করে "আরব বিজয়" হিসেবে উল্লেখ করে।[৬৫][৬৬]


ডক্টরিনা জ্যাকবি (ইয়াকুবের শিক্ষা) নামে পরিচিত একটি গ্রীক ভাষার রচনা ৬৩৪ সালে, মুহাম্মাদের মৃত্যুর দুই বছর পরে লেখা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই রচনায় Candidatus (ক্যান্ডিডেটাস) নামক এক ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদ এবং আরব উপদ্বীপে একজন নতুন নবীর আবির্ভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।[৬৭][৬৮] ধারণা করা হয় যে, এই রচনাটি কার্থেজে লেখা হলেও ৬৩৪-৬৪০ সালের মধ্যে ফিলিস্তিনে রচিত হয়েছিল।[৬৯] প্যাট্রিসিয়া ক্রোন এবং মাইকেল কুক মত প্রকাশ করেছেন যে, এই রচনাটি ৬৩৪ সালে কার্থেজে লেখা হয়েছিল এবং ঐ তারিখের কয়েক বছর পরে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। ৬৪০ সালের ধারণাটি তাদের মতে অনেক পরে।[৬৯]

এখানে উল্লেখিত "ক্যান্ডিডেটাস" সম্পর্কে গবেষকদের ধারণা, এটি সম্ভবত বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ফিলিস্তিনের কমান্ডার সার্জিয়াস। বর্ণিত ঘটনাটি ৬৩৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফিলিস্তিনের গাজা শহরের কাছে রাশিদুন খিলাফতের সেনাবাহিনী এবং বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘটিত "দাসিনের যুদ্ধ"।[৭০] মুহাম্মাদের মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পর সংঘটিত এই যুদ্ধে, আমর ইবনুল আস এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী পূর্ব রোমান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হয় এবং কমান্ডার সার্জিয়াস ও তার অশ্বারোহীরা নিহত হয়।[৭১] "ইয়াকুবের শিক্ষা" গ্রন্থেও লেখা আছে যে, ঐ অঞ্চলে সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাসকারী এবং পূর্ব রোমানদের অত্যাচারের শিকার ইহুদিরা মুসলিমদের এই বিজয় উদযাপন করে এবং সার্জিয়াসের মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করে।[৭১][৭২] মুহাম্মাদ সম্পর্কে সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিককার আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায় আর্মেনীয় বিশপ সেবেওসের কাছ থেকে, যিনি ব্যাগ্রাতুনি রাজবংশের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তার বর্ণনা অনুসারে, তিনি এমন এক সময়ে লিখেছেন যখন আরবদের আকস্মিক উত্থানের স্মৃতি এখনও তাজা ছিল। সেবেওস মুহাম্মাদের নাম এবং তার পেশা বণিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ঐশ্বরিক বাণীর মাধ্যমে তার জীবন হঠাৎ পরিবর্তিত হয়েছিল।[৭৩] মুসলিমরা কী করছে তা ভেবে দেখেছিলেন এবং ইসলামের উত্থানের জন্য একটি তত্ত্ব প্রদানকারী সেবেওস ছিলেন প্রথম অমুসলিম লেখক।[৭৪]

বিখ্যাত স্কটিশ লেখক অ্যান্ড্রু মার তার বিখ্যাত বই "বৃহত্তর বিশ্বের ইতিহাস" ("এ হিস্ট্রি অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড")-এ মুহাম্মাদের ঐতিহাসিকতা সম্পর্কে লিখেছেন। বইটি অবলম্বনে ২০১২ সালে বিবিসি একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে যার শিরোনাম ছিল এ্যান্ড্রু মার'স হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড[৭৭]

মার মুহাম্মাদের ঐতিহাসিকতার বিষয়ে নিম্নলিখিত বক্তব্য দিয়েছেন:

অন্যান্য ইহুদি নবী এবং এমনকি যীশু খ্রীষ্টের ঐতিহাসিকতা বিতর্কিত হলেও, মুহাম্মাদকে বেশিরভাগ পণ্ডিত এবং ইতিহাসবিদ "ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব" হিসেবে গ্রহণ করেন।[৭৯][৮০][৮১]

বংশধারা

মুহাম্মাদ এর পিতা আবদুল্লাহ এবং মাতা আমিনা, যাদের উভয়েরই পূর্বপুরুষ মুররাহ ইবনে কা'ব, তাদের পূর্ণাঙ্গ বংশলতিকা।

সুপ্রচলিত ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে, মুহাম্মাদ ইব্রাহিম এর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাইল এর বংশধরের মধ্য হতে আগত। তার বংশলতিকা আদনানি উপজাতি পর্যন্ত বিস্তৃত এবং আরো নির্দিষ্টভাবে কুরাইশ বংশের হাশিমী শাখা হতে উদ্ভূত।[৮২] তার পূর্বপুরুষদের বংশক্রম: মুহাম্মাদ, আব্দুল্লাহআব্দুল মুত্তালিব (শায়বা), হাশিমআবদ মানাফ (মুগিরা), কুসাইকিলাবমুররাহকা'বলুয়াইগালিবফিহরমালিকনাদর (কুরাইশ)কিনানাহ (কিনানা উপজাতি), হুজাইমা, মুদরিকা (আমির), ইলিয়াস, মুদারনিজারমা'আদআদনান[৮৩][৮৪][৮৫][৮৬][৮৭]

অন্যদিকে, কিছু হাদিস অনুসারে মুহাম্মাদ নিজের বংশধারা ইব্রাহিম এর সাথে সংযুক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন,

ঐতিহ্য অনুসারে, মক্কা বিজয়ের পর যখন কাবাঘর থেকে মূর্তিগুলো সরিয়ে ফেলা হচ্ছিল, তখন কাবার ভেতর থেকে হাতে ভবিষ্যদ্বাণীর তীর ধারণকারী ইব্রাহিম ও তার পুত্র ইসমাইল এর মূর্তি উদ্ধার করা হয়। মুহাম্মাদ তখন বলেছিলেন যে তারা কখনোই এমন কাজ করেননি এবং মূর্তিপূজার উপকরণ হিসেবে তাদের ব্যবহারের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। অন্য একটি হাদিস অনুসারে, মুহাম্মাদ তার নাতি হাসান ও হুসাইন এর জন্য যে দোয়া করেছিলেন, ইব্রাহিম পূর্বে তার নিজ পুত্র ইসমাইল ও ইসহাক এর জন্য একই দোয়া করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন।[৯০]

কিছু সংশোধনবাদী গবেষকের মতে, "কুরাইশ" নামটি নবী মুহাম্মাদ এর বংশধরদের গোত্রের নাম নয়, বরং এটি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে পারস্যে হাখমানেশি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা পারস্য সম্রাট কুরুশের নাম। সম্রাট কুরুশ ব্যাবিলনীয় বন্দিদশা থেকে ইহুদিদের মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ইহুদিদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব।[৯১] ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, মুহাম্মাদ এর বংশোদ্ভূত কুরাইশ গোত্রটি প্রাচীন আরব সভ্যতা নবতাঈদের একটি শাখা ছিল। নবতাঈদের আদি বাসস্থান ছিল আরব উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এবং তারা তাদের নিজস্ব লিপি ও ভাষার অধিকারী ছিল। নবতাঈদের বংশোদ্ভূতি নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান।[৯২] কিছু মতামত অনুসারে, তারা আদি আরব বংশোদ্ভূত, যদিও পরবর্তীতে পারস্যদের সাথে মিশে তাদের বংশধারা ও ভাষায় পরিবর্তন আসে।[৯২]

জন্ম তারিখ

মুহাম্মাদের জন্মের সময় আরব উপদ্বীপের বড় বড় গোত্র এবং তাদের বসবাসের স্থান।

প্রচলিত ধারণা অনুসারে, ইসলামের ইতিহাসে "ফিলবর্ষ" (হস্তিবর্ষ) নামে পরিচিত সময়ে হযরত মুহাম্মাদ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।[৯৩] ঐতিহ্য অনুসারে, এই বছরটি হলো আবিসিনিয়ার আকসুম রাজ্যের অধীনস্থ ইয়েমেনের রাজা আবরাহা কাবাঘর আক্রমণের জন্য বিশাল হাতিবাহিনী নিয়ে ব্যর্থ অভিযান চালানোর বছর।[৯৪][৯৫] এই নির্দিষ্ট তারিখটি স্পষ্টভাবে জানা যায় না এবং পূর্ববর্তী সময়ের হিসাব অনুসারে বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন ভিন্ন তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানি ইসলামী পণ্ডিত মোহাম্মদ হামিদুল্লাহর মতে, তারিখটি ১৭ জুন ৫৬৯;[৯৩] কিছু উৎসে ৫৭০ সাল উল্লেখ করা হয়েছে;[৯৬][৯৭] মিশরীয় পণ্ডিত মাহমুদ পাশা আল-ফালাকীর মতে, তারিখটি ২০ এপ্রিল ৫৭১।[৯৮] ব্রিটিশ লেখক শেরার্ড বোমন্ট বার্নাবী আল-ফালাকীর হিসাবের কিছু ত্রুটি উদঘাটন করেছেন।[৯৯]

ইসলামী উৎসগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী মুহাম্মাদ ৫৭১ সালে, ফিল ঘটনা এর বছর, ১২ই রবিউল আউয়াল (২০শে এপ্রিল) সোমবার রাতে জন্মগ্রহণ করেন।[১০০] এই তারিখটি ফিল ঘটনা এর ৫২ দিন পরে।[৯৮][১০১] সীরাত ও ইসলামী ইতিহাসের লেখকরা এই বিষয়ে একমত যে, নবী মুহাম্মাদ রবিউল আউয়াল মাসের একটি সোমবার ভোরবেলা, সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ আগে জন্মগ্রহণ করেন। তবে, মাসের কত তারিখে তিনি জন্মগ্রহণ করেন সে বিষয়ে তাদের মতপার্থক্য রয়েছে।[৯৮] এই মতভেদের কারণ হিসেবে মৌখিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে রিওয়ায়েতের বৈচিত্র্য, চন্দ্র ক্যালেন্ডার ও সৌর ক্যালেন্ডারের পার্থক্য[১০২][১০৩] এবং আরবদের "নাসি" প্রথা (বছরকে ১২ মাসের পরিবর্তে ১০ মাস ধার্য করা) উল্লেখ করা হয়।[১০১]

লরেন্স কনরাড মৌখিক যুগের পরের প্রাথমিক যুগে লেখা জীবনী গ্রন্থগুলো পর্যালোচনা করেছেন এবং এই গ্রন্থগুলোতে মুহাম্মাদের জন্ম তারিখের ক্ষেত্রে ৮৫ বছরের সময়কালের ব্যবধান দেখতে পেয়েছেন। কনরাড এটিকে "গল্পের প্রবাহিততা (বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়া) এখনও চলমান" হিসাবে বর্ণনা করেছেন।[১০৪][১০৫]

সাধারণ ভৌগোলিক অবস্থা

ইসলাম-পূর্ব আরব উপদ্বীপের প্রধান বাণিজ্য পথ।

ইসলাম পূর্ববর্তী আরব উপদ্বীপে, কঠিন পরিবেশগত পরিস্থিতি এবং জীবনধারার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে মরুভূমির পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার জন্য, মানুষের একসাথে বসবাস করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। এর ফলে, যে গোষ্ঠীগুলোর উত্থান হয়েছিল সেগুলো রক্তের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছিল।[১০৬] স্থানীয় আরবরা, যাযাবর এবং স্থায়ী উভয় জীবনযাপনই করত।[১০৭] পানি এবং চারণভূমি খুঁজে বের করার জন্য যাযাবররা একসাথে একটি স্থান থেকে অন্য স্থানে যেত, অন্যদিকে স্থায়ী জীবনযাপনকারীরা বাণিজ্য এবং কৃষিকাজের সাথে জড়িত ছিল। কাফেলা বা ওয়াহাতে আক্রমণ করাও যাযাবরদের জীবনের একটি অংশ ছিল এবং তারা এটিকে অপরাধ বলে মনে করত না।[১০৮][১০৯][১১০]

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ থেকে, মসলা বাণিজ্যের মাধ্যমে সমৃদ্ধ বেশ কিছু উন্নত রাজ্য দক্ষিণ আরবে অস্তিত্ব লাভ করেছিল। প্রাথমিকভাবে, বাণিজ্য পথগুলো উত্তর-পশ্চিম উপকূল দিয়ে চলেছিল, কিন্তু ৭ম শতাব্দীর পর থেকে, ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবসায়ীরা লোহিত সাগরের উপর দিয়ে সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে পছন্দ করায়, এই অঞ্চলের বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছিল এবং অনেক অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ স্থান অবনতির দিকে ধাবিত হয়েছিল।[১১১] ধান্য এবং জলপাই তেলের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের পাশাপাশি উল এবং চামড়ার বাণিজ্য, আরও স্থানীয় বাণিজ্যিক কার্যকলাপের উপর নির্ভরশীল মক্কা এবং মদিনা (যা তখন "ইয়াসরিব" নামে পরিচিত ছিল) এর মতো কয়েকটি শহর টিকে ছিল। আরব উপদ্বীপের মরুভূমির অঞ্চলগুলো ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। বেদুঈন গোষ্ঠীগুলো যাযাবর জীবনধারা গ্রহণ করেছিল এবং সীমিত সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিযোগিতাপূর্ণভাবে সমাজকে রূপ দিয়েছিল; প্রধানত বংশ বা গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য স্বীকৃত হয়েছিল।[১১১]

ইসলামের উত্থানের পূর্বে, ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপবাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং সাসানীয় সাম্রাজ্য

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে, বাইজেন্টাইন এবং সাসানি সাম্রাজ্য ছিল দুটি প্রধান শক্তি যারা মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ন্ত্রণ করত। শতাব্দী দীর্ঘ পারস্য-রোমান যুদ্ধ এই অঞ্চলকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। পারস্যদের লাখমিদ এবং রোমানদের গাসানীদের মতো সামন্ত রাষ্ট্র ছিল এই অঞ্চলে। আরব উপদ্বীপের ভূগোল অত্যন্ত শুষ্ক এবং আগ্নেয়মৃত্তিকার কারণে, মরুদ্যান এবং পানির উৎস ছাড়া অন্যত্র কৃষি করা কঠিন ছিল। মরুভূমির মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিন্দু-আকৃতির গ্রাম এবং শহরগুলো এই অঞ্চলের সাধারণ চিত্র তুলে ধরে। মক্কা এবং মদিনা (ইয়াসরিব) ছিল এই শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মদিনা ছিল একটি ক্রমবর্ধমান বৃহৎ কৃষিক্ষেত্র, যখন মক্কা ছিল অনেক গোষ্ঠী দ্বারা বেষ্টিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র এবং হজের কারণে একটি তীর্থস্থান।[১১২] মুহাম্মাদের জীবনের প্রথম দিকে, তার অন্তর্গত কুরাইশ গোত্র পশ্চিম আরবে একটি প্রভাবশালী শক্তি হয়ে ওঠে।[১১৩][১১৪] কুরাইশরা পশ্চিম আরবের অনেক গোষ্ঠীর সদস্যদের কাবা ঘরের সাথে যুক্ত করে এবং এই মক্কার তীর্থক্ষেত্রের মর্যাদা বৃদ্ধি করে একটি সাংস্কৃতিক ঐক্য স্থাপন করে।[১১৪]

জাহেলি যুগ

ইসলামী সাহিত্যে, আরব সমাজের ইসলাম পূর্ব যুগকে "আইয়ামে জাহেলিয়া" বা মূর্খতার যুগ বলা হয়।[১১৫] ইসলামী যুগে উদ্ভূত এই শব্দটি কুরআন ও হাদিসে আরবদের ইসলাম পূর্ব বিশ্বাস, মনোভাব ও আচরণ, সামাজিক জীবন দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণভাবে ব্যক্তি ও সমাজের পাপ ও বিদ্রোহকে ইসলামী যুগ থেকে আলাদা করতে বা গ্রহনযোগ্য করতে ব্যবহৃত হয়।[১১৫] জাহেলিয়া যুগের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়: ব্যভিচারপরকীয়া, চুরি, মূর্তিপূজা, অন্যায়, সহিংসতা, গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্তহীন রক্তক্ষয়ী বিবাদ, ডাকাতিদাসপ্রথা, বিশেষ করে নারীর দাসত্ব এবং পণ্যের মতো ক্রয়-বিক্রয়, নারীর প্রতি এমন অবমাননা যে জাহেলিয়া সমাজের মানুষদের কাছে মেয়ে সন্তানকে লজ্জা বলে মনে করা হত এবং কন্যাসন্তানকে জীবন্ত অবস্থাতেই কবর দেয়ার নিদর্শনও ছিল।[১১৬]

ইসলামী ইতিহাসগ্রন্থ অনুসারে, জাহেলিয়াতের যুগের কবিতায় নারীর উপলব্ধি সমাজজীবনে প্রতিফলিত হয়নি। নারীকে নিম্ন শ্রেণীর মানুষ হিসেবে দেখা হতো। সীমাহীন বহুবিবাহ প্রচলিত ছিল। পতিতাবৃত্তি একটি সাধারণ পেশায় পরিণত হয়েছিল এবং দাস মালিকরা তাদের ক্রীতদাসদের এটি করতে বাধ্য করত। নারীদের পিতা বা স্বামীর উত্তরাধিকারের অংশ পাওয়ার অধিকার ছিল না। সন্তানরা চাইলে বাবার মৃত্যুর পর তাদের সৎ মাকে বিয়ে করতে পারত। বিবাহবিচ্ছেদের অধিকারও শুধুমাত্র পুরুষদের ছিল এবং তা সীমাহীন ছিল। যখন সম্ভ্রান্তদের কন্যা সন্তানের জন্ম হম, তখন তারা এটিকে লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখতে এবং তাদের হত্যা করতেও পিছপা হতোনা।[১১৬] ইসলামী সমাজের স্মৃতিতে, জাহেলিয়া যুগে জীবিত কন্যা শিশুকে মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।[১১৭] কুরআনের সূরা তাকভীর এর ৮ম ও ৯ম আয়াতে কন্যা শিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে এই ঘটনার সমালোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে,

কন্যা শিশুকে জীবন্ত কবর দেয়ার প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল না, তবে মাঝে মাঝে এটি করা হত। কিছু গোত্রের মধ্যে এই ঘটনা বেশি দেখা গেলেও, অন্যদের মধ্যে এটি খুবই বিরল ছিল। এছাড়াও, শহরের তুলনায় মরুভূমি ও গ্রামাঞ্চলে এটি বেশি দেখা যেত। তবে, মুহাম্মাদের গোত্র কুরাইশদের মধ্যে এই প্রথা বিদ্যমান ছিল বলে মনে করা হয়, তবে তা ব্যাপক ছিল না।[১১৭] আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক যে, কোরবানি দেওয়া বা অন্য কারণে শিশু হত্যার ক্ষেত্রে আরবরা অন্য জাতিদের তুলনায় খুব বেশি আলাদা ছিল না।[১১৮]

উপাসনা ও ধর্মীয় গোষ্ঠী

মক্কার কাবা ৩৬০টি মূর্তির আবাসস্থল ছিল, যা বিভিন্ন গোত্রের রক্ষাকর্তা দেবতা হিসেবে বিবেচিত হত।[১১৯] মানাতলাত ও উজ্জা নামক তিন দেবীকে প্রধান দেবতা ইলাহ এর কন্যা বলে মনে করা হত। এই সময়ের অধিকাংশ আরব বাসিন্দা বহুঈশ্বরবাদ ও পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী ছিল।[১২১] কিছু আরব গোত্র আল্লাহ'র অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিল, তবে পরকাল ও কিয়ামতের ধারণা তাদের মধ্যে ছিল না।[১২১] বেশিরভাগ মূর্তিপূজক মূর্তিগুলোকে ঈশ্বর হিসেবে গ্রহন করত না, বরং ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর জন্য এক ধরণের মাধ্যম হিসেবে দেখত।[১২১] যুদ্ধ নিষিদ্ধ তীর্থের মাসগুলোতে (হারাম মাস) আরব গোত্রগুলো উৎসব ও মেলায় অংশগ্রহণ করত।[১২২] এই উৎসবগুলোতে তারা নিজ নিজ গোত্রের মূর্তির প্রতি প্রার্থনা, সিজদা ও সম্মান প্রদর্শন করত, মূর্তির নামে কুরবানি দিত এবং দান করত। এরপর প্রতিটি গোত্র কাবা তাওয়াফ করত। এই তাওয়াফ সাধারণত উলঙ্গ অবস্থায় করা হত।[১২৩] এই পরিদর্শনগুলোতে তারা দেবতাদের বিভিন্ন উপহার দান করত, সুগন্ধি ব্যবহার করত এবং এমনকি এই পরিদর্শনগুলোর পূর্বে রোজা (উপস) রাখত।[১২৩] এই সময়ে বদনজর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাবিজ ও কবজ ব্যবহার করাও ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।[১২৩]

আরব উপদ্বীপের স্থানীয় আরবদের মধ্যে হানিফরা ছিল একঈশ্বরবাদী বিশ্বাসীদের একটি সম্প্রদায়।[১২৫] তাদেরকে ভুলভাবে মাঝে মাঝে খ্রিস্টান ও ইহুদিদের সাথে শ্রেণীবদ্ধ করা হত।[১২৬] ইসলামী শিক্ষা অনুসারে, ইসলাম পূর্ব যুগে ইব্রাহিম কর্তৃক প্রচারিত ধর্মের অনুসারীদের হানিফ বলা হত।[১২৭] কুরআনের কিছু আয়াতে "হানিফ" শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে এবং হানিফ ধর্মকে মুশরিক ও পৌত্তলিকদের বহুঈশ্বরবাদী ধর্মের থেকে আলাদা ও তার বিপরীত এবং ইব্রাহিম এর ধর্ম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা বাকারা এর ১৩৫নং আয়াতে বলা হয়েছে,

ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে, মুহাম্মাদও একজন হানিফ ছিলেন এবং তিনি ইব্রাহিম এর পুত্র ইসমাইল এর বংশধর ছিলেন।[১২৮][১২৯][১৩০]

নবী আগমনের প্রত্যাশা

ধ্রুপদী ধর্মীয় বর্ণনা অনুসারে, ইসলাম পূর্ব যুগে, হানিফ ধর্মাবলম্বী আরব কবিরা, যাদের রহস্যময় ক্ষমতার অধিকারী বলেও মনে করা হত, তাদের কবিতায় একজন নবীর আসন্ন আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। যদিও কুরআনে ভবিষ্যদ্বাণী ও অনুরূপ অনুশীলনগুলোকে সমর্থন করা হয় না, তবুও ওসব সমাজে এই ধরণের বক্তব্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হত।[১৩১]

কুরআনের সূরা আস-সাফ‌ এর ৬নং আয়াত অনুসারে, নবী ঈসা বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করে বলেছিলেন:

মুহাম্মাদ এর নাম বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে একটি ধারণা প্রচলিত। এর মধ্যে একটি হাদিসে বলা হয়েছে, "আমার নাম কুরআনে মুহাম্মাদ, ইঞ্জিলে আহমদ এবং তাওরাতে আহ্যদ।"[১৩৩] তবে, বর্তমান আধুনিক ইঞ্জিলগুলোতে এই নামগুলোর স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে, কিছু ইসলামী পণ্ডিত যোহন ইঞ্জিলের "পারাক্লিত" শব্দটিকে মুহাম্মাদ এর সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করেন।[১৩৪] খ্রিস্টধর্মে পারাক্লিত-কে "পবিত্র আত্মা" হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।[১৩৫] যোহন ইঞ্জিলের ১৪তম অধ্যায়ে, যিশু কর্তৃক পারাক্লিত ("সত্যের আত্মা") সম্পর্কে বলা হয়েছে,

সপ্তদশ শতাব্দীর বিখ্যাত উসমানীয় পর্যটক ইভলিয়া সেলেবি[১৩৮][১৩৯] তার সেয়াহতনামা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে তিনি লেবাননের দক্ষিণে নাকুরা শহরের কাছে প্রেরিত পিতর এর সমাধিতে একটি ইঞ্জিলের পাণ্ডুলিপি খুঁজে পেয়েছেন।[১৪০] প্রেরিত পিতর ছিলেন যিশু এর একজন হাওয়ারী। ইভলিয়া সেলেবি দাবি করেছেন যে ওই পাণ্ডুলিপিতে মুহাম্মাদ এর আগমনের সুসংবাদ বর্ণিত ছিল। তিনি আরও দাবি করেছেন যে ওই পাণ্ডুলিপিটি স্বয়ং প্রেরিত পিতর লিখেছিলেন।[১৩৮][১৪১][১৪২] কিন্তু ইভলিয়া সেলেবি কর্তৃক উল্লেখিত ওই পাণ্ডুলিপিটি আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মক্কার জীবন  

সারসংক্ষেপ:

কিছু উৎস অনুসারে, মুহাম্মাদ ৫৭০ সালে[১৪৩][১৪৪][১৪৫] এবং কিছু উৎস অনুসারে ৫৭১ সালে[১৪৬] আরবের মক্কা শহরে জন্মগ্রহণ করেন।[১৪৩][১৪৪][১৪৭] জন্মের আগে তার বাবা আব্দুল্লাহ মারা যান এবং ৬ বছর বয়সে তার মা আমিনা মারা যাওয়ার পর তার চাচা আবু তালিব তাকে লালন-পালন করেন। শৈশবে তিনি চরবাহা (মেষপালন) করতেন এবং তারপর একজন ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করেন। প্রথমবারের মতো ২৫ বছর বয়সে তিনি মক্কার বিখ্যাত এবং সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, ৪০ বছর বয়সী একজন ধনী বিধবা খাদিজাকে বিবাহ করেন।[১৪৮]

মুহাম্মাদ নিয়মিতভাবে কিছু রাত নূর পর্বতের হেরা গুহায় গিয়ে ধ্যান করতেন। ৩৫ বছর বয়সের পর তার এই অভ্যাস আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে। ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে, ৪০ বছর বয়সে[১৪৩][১৪৪] কুরআনের প্রথম আয়াত মুহাম্মাদের উপর অবতীর্ণ হয়[১৪৯] এবং তিনি জানান যে এগুলো আল্লাহর নিকট হতে জিবরাঈল ফেরেশতা কর্তৃক প্রেরিত। প্রথমে তিনি কেবল আপনজনদের ইসলামের প্রতি আহ্বান জানা এবং তিন বছর পর থেকে মানুষকে সামগ্রিকভাবে ইসলামে আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন।[১৫০] তিনি আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয় এই বার্তা প্রচার করেন এবং বলেন যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ।[১৫১] তিনি নিজেকে আল্লাহর রাসুল ও নবী হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বলেন যে তিনি পূর্ববর্তী নবীদের বংশধর।[১৫২][১৫৩]

প্রথম দিকে মুহাম্মাদের অনুসারী সংখ্যা ছিল অল্প। তিনি মক্কার কিছু গোত্র এবং কিছু আত্মীয়ের বিরোধিতার সম্মুখীন হন। এই সময়ে তার অনুসারীরা তীব্র নির্যাতনের শিকার হওয়ায় তিনি ৬১৫ সালে কিছু অনুসারীকে আবিসিনিয়ার আকসুম রাজ্যে পাঠান। ৬২২ সালে নিজের অনুসারীদের সাথে মদিনায় হিজরত করেন।

শৈশব ও কৈশোর

মুহাম্মাদ এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মাতা কুরাইশ গোত্রের ওয়াহাব ইবনে আবদ মান্নাফ-এর কন্যা আমিনা। জন্মের প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগেই মুহাম্মাদ এর পিতা আবদুল্লাহ মারা যান। এরপর তার লালন-পালনের ভার দাদা আবদুল মুত্তালিব গ্রহণ করেন। আবদুল মুত্তালিব তার নাম "মুহাম্মাদ" রাখেন। তার মাতা আমিনা শিশু মুহাম্মাদকে পূর্ণাঙ্গভাবে স্তন্যদান করতে পারেননি। কিছু সময়ের জন্য মুহাম্মাদকে তার চাচা আবু লাহাব-এর দাসী সুওয়াইবা স্তন্যদান করেন।[১৬২] তৎকালীন আরবের রীতিনীতি অনুসারে, মক্কার নবজাতকদের মরুভূমি ও প্রকৃতির জীবনকে শিশুদের জন্য আরও স্বাস্থ্যকর মনে করে, কিছু সময়ের জন্য মরুভূমিতে একটি বেদুঈন পরিবারের সাথে থাকার জন্য পাঠানো হত এবং স্তন্যদাত্রী মহিলাদের দ্বারা স্তন্যদান ও লালনপালন করা হত।[১৬৩][১৬৪] বাবা না থাকায় এক অনাথের যত্ন নেওয়া লাভজনক হবে না ভেবে স্তন্যদানকারী মহিলারা মুহাম্মাদকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।[১৬৩]

মুহাম্মাদ জন্মের পর প্রায় চার বছর পর্যন্ত তার দুধমা হালিমা সাদিয়ার কাছে ছিলেন। তার মা আমিনাও এই সময়ে তার দেখাশোনা করতেন। চার বছর বয়সে তিনি মায়ের কাছে ফিরে আসেন এবং ছয় বছর বয়স পর্যন্ত তার স্নেহ ও যত্নে বেড়ে ওঠেন।[৯৮] ছয় বছর বয়সে, মুহাম্মাদ তার মা আমিনা এবং ধাত্রী উম্মে আইমান এর সাথে তার বাবার সমাধি দেখতে এবং কিছু আত্মীয়-স্বজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে মদিনায় যাত্রা করেন।[১৬৮] মদিনায় তিনি তার মায়ের আত্মীয় বনু নাজ্জার গোত্রের কাছে এক মাসের জন্য অবস্থান করেন। এরপর মক্কায় ফেরার পথে আবওয়া গ্রামে পৌঁছালে তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন[১৬৮] এবং সেখানেই খুব অল্প বয়সে মারা যান। তাকে সেখানেই সমাহিত করা হয়।[১৬৯] ধাত্রী উম্মে আইমান মুহাম্মাদকে মক্কায় নিয়ে এসে তার দাদা আবদুল মুত্তালিব এর কাছে হস্তান্তর করেন।

ছয় বছর থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত, তার দাদা আবদুল মুত্তালিব তার দেখাশোনা করেন। আবদুল মুত্তালিব বয়সের দিক থেকে আশি বছরেরও বেশি বয়স্ক এক বৃদ্ধ ছিলেন। মুহাম্মাদের আট বছর বয়সে, তার দাদাও অসুস্থ হয়ে মারা যান। মারা যাওয়ার আগে, তিনি তার পুত্র আবু তালিবকে তাকে লালনপালনের জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিছু উৎস বলে যে, আবদুল মুত্তালিব চেয়েছিলেন যে তার দুই পুত্র আবু তালিব এবং যুবায়ের এর মধ্যে কুরা (ভাগ্য নির্ধারণের জন্য লটারি) টেনে মুহাম্মাদের লালনপালনের দায়িত্ব কার হবে তা নির্ধারণ করা হোক এবং কুরা আবু তালিবের পক্ষে এসেছিল।[৯৮] ফলস্বরূপ, মুহাম্মাদ তার বনু হাশিম গোত্রের নবনির্বাচিত নেতা চাচা আবু তালিবের অভিভাবকত্বে আশ্রয় লাভ করেন।[১৭০]


কথিত আছে, মুহাম্মাদ যখন প্রায় ১২ বছর বয়সী ছিলেন, তখন তার চাচা আবু তালিব ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যান এবং তাকেও সাথে নিয়ে যান। এই ভ্রমণে তিনি বাইজেন্টাইন শাসিত বুসরা শহরে বহিরা নামে একজন খ্রিস্টান সন্ন্যাসীর সাথে পরিচিত হন।[১৭১] ঐতিহ্য অনুসারে, বহিরা শিশু মুহাম্মাদকে পর্যবেক্ষণ এবং তার সাথে কথোপকথন করার পর তার চাচা আবু তালিবকে জানান যে তিনিই হবেন শেষ নবী।[১৭২] এরপর তিনি শিশু মুহাম্মাদকে ইহুদি ও বাইজেন্টাইনদের হাত থেকে রক্ষা করার এবং শামে (তৎকালীন সিরিয়ার নাম) না যাওয়ার পরামর্শ দেন।[১৭১][১৭৩] পরবর্তী বছরগুলোতে, মুহাম্মাদ ১৭ বছর বয়সে তার অন্য চাচা যুবায়ের ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সাথে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ইয়েমেনে যান। ধারণা করা হয় যে এই ভ্রমণগুলো মুহাম্মাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং মানসিক ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এছাড়াও তার যৌবনে তিনি তার চাচাদের সাথে কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মধ্যে সংঘটিত ফিজার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধগুলোতে তিনি তলোয়ার বাজিয়ে যুদ্ধ না করে ছুঁড়ে আসা তীর সংগ্রহ করে তার চাচাদের হাতে তুলে দিতেন।[১৭৪]

ব্যবসায়িক জীবন ও খাদিজার সাথে বিবাহ

মুহাম্মাদের যৌবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায় কারণ বিদ্যমান তথ্য খণ্ডিত এবং ঐতিহাসিক তথ্য থেকে কিংবদন্তি আলাদা করা কঠিন।[১৭৫][১৭৬] তবে, তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন এবং ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে ব্যবসা করতেন বলে জানা যায়।[১৭৭] ব্যবসায়িক জীবনের পূর্বে, মুহাম্মাদ কিছুকাল তার চাচা আবু তালিবের আর্থিক সহায়তার জন্য পশুপালন করতেন এবং বড় হওয়ার পর ব্যবসায় নিয়োজিত হন। ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তাকে পরবর্তীতে তার স্ত্রী খাদিজার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।[১৭৮] ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তাকে পরবর্তীতে তার স্ত্রী খাদিজার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। ৫৯৪-৫৯৫ সালে তিনি খাদিজার সাথে অংশীদারিত্বে কাজ শুরু করেন এবং তার মূলধন ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করেন।[১৭৯]

কয়েকটি ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের পর, খাদিজা মুহাম্মাদের সততায় মুগ্ধ হন এবং তাকে অত্যন্ত পছন্দ করতে শুরু করেন। তার বান্ধবী নফিসা বিনতে উমাইয়া এর মাধ্যমে তিনি মুহাম্মাদকে বিবাহ করার প্রস্তাব পাঠান। মুহাম্মাদ খাদিজার প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং তার চাচাদের সাথে গিয়ে খাদিজার জন্য আনুষ্ঠানিক বিবাহের প্রস্তাব পাঠান।[১৮১] খাদিজার চাচাও প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন এবং বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের সময় মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৩-২৫ বছর[১৮২][১৮৩][১৮৪] এবং খাদিজার বয়স ছিল প্রায় ৪০ বছর।[১৮৩][১৮৪] তবে, কিছু উৎসে বলা হয়েছে যে বিবাহের সময় খাদিজার বয়স ছিল ২০-এর শেষের দিকে বা ৩০-এর শুরুর দিকে।[১৮৫] অধিকাংশ ইসলামী পণ্ডিত এই বিকল্প বয়সের তথ্যগুলোকে দুর্বল বলে মনে করেন।[১৮৪]

ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, মুহাম্মাদ তার যৌবনে তার চারপাশের লোকদের পৌত্তলিক বিশ্বাস ও রীতিনীতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন না।[১৮৬] এই সময়ে তিনি নিজে কোনো মূর্তির পূজা করতেন না, তবে অন্যদের পূজা করার বিরোধিতাও করেননি। মক্কার মানুষের অন্যায়, কুৎসিত, শিরক (বহুঈশ্বরবাদ) এবং মূর্তিপূজায় পূর্ণ জীবনযাত্রা মুহাম্মাদ এর পছন্দ ছিল না। তিনি একাকীত্বে থাকা (ধ্যানমগ্ন) এবং চিন্তাভাবনা করার মাধ্যমে এর সমাধান খুঁজে বের করতেন।

নিম্নোক্ত কুরআনের আয়াতগুলো ইসলাম-পূর্ব মুহাম্মাদ এর অবস্থা ব্যাখ্যা করে:[১৮৭][১৮৮]

কাবা মধ্যস্থতা

মুহাম্মাদ এর ৩৫ বছর বয়সে, মক্কায় ঘন ঘন বন্যার কারণে কাবার কিছু অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর, তিনি কাবার মেরামতের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে জানা যায়।[১৮৯]


এই ঘটনার পর কুরাইশ গোত্র কাবা ভেঙে পুনরায় নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয়।[১৯০] কিন্তু তাদের এই কাজের ফলে দেবতাগণ রুষ্ট হবেন এমন আশঙ্কা দেখা দেয়।[১৯০] আরবদের মধ্যে ইব্রাহিম এর আমল থেকেই কাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপন একটি পবিত্র কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হম।[১৯১]

] এরপর কাবা ইব্রাহিম এর স্থাপিত ভিত্তি পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয় এবং পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়। জেদ্দা উপকূলে একটি জাহাজ ভেঙে গিয়েছিল এবং সেই জাহাজে স্থাপত্যবিদ্যায় পারদর্শী একজন কারিগর ছিলেন। সেই জাহাজের মেরামতের সরঞ্জামও কিনে কাবার নির্মাণে ব্যবহার করা হয়।[১৯১][১৯২]

ইবনে ইশাকের সংগ্রহিত একটি বর্ণনা অনুসারে, পুনর্নির্মাণ প্রায় সম্পূর্ণ হলে, কাবা শরীফের হাজরে আসওয়াদ পাথরটি স্থাপন করার সম্মান কোন গোত্র পাবে তা নিয়ে গোত্রপ্রধানদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। সেখানকার এক বয়স্ক ব্যক্তি প্রস্তাব দেন যে কা'বা অবস্থিত এলাকায়, অর্থাৎ মসজিদুল হারামে প্রবেশকারী পরবর্তী ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া হোক এবং তাকে "হাকেম" নিযুক্ত করা হোক। পরবর্তীতে মসজিদে প্রবেশকারী ব্যক্তি ছিলেন মুহাম্মাদ। সকলে অধীর আগ্রহের সাথে মুহাম্মাদ এর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রইল। মুহাম্মাদ কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর একটি চাদর আনার নির্দেশ দেন অথবা নিজের পোশাক খুলে চাদর হিসেবে ব্যবহার করেন। এরপর তিনি পাথরটি চাদরের মাঝখানে রাখেন এবং প্রতিটি গোত্রের গোত্রপ্রধানকে চাদরের এক প্রান্ত ধরে তুলতে বলেন। তারপর তিনি পাথরটি হাতে নিয়ে যথাস্থানে স্থাপন করলেন।[১৯০][১৯২] এই ঘটনা এবং "আহল আল-কিসা"-এ বর্ণিত ঘটনার কারণে মুহাম্মাদ এর আবৃত পোশাক বা চাদর (আবা) পরবর্তীকালে কবি ও লেখকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।[১৯৩]

প্রথম ওহী ও কুরআনের সূচনা 

সীরাতের বর্ণনা অনুসারে, যখন মুহাম্মাদ ৪০ বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছালেন, তখন তিনি প্রায়শই জনসমাগম থেকে দূরে সরে গিয়ে একাকীত্বে সময় কাটাতে শুরু করেন।[১৯৪] এই অবস্থা প্রায় ১-২ বছর ধরে চলতে থাকে। মুহাম্মাদ মক্কা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে নূর পর্বতের হেরা গুহায় তার দাদা আবদুল মুত্তালিবের মতো প্রতি বছর কয়েক সপ্তাহ ধরে একা একা থেকে ইতিকাফ (ধ্যান) করতেন।[১৯৫] ইসলামী শিক্ষা অনুসারে, ৬১০ খ্রিস্টাব্দে, রমজান মাসের একটি রাতে (কদর রাত) তিনি হেরা গুহায় চাদর জড়িয়ে ধ্যানে মগ্ন থাকাকালীন আল্লাহর নিকট হতে ফেরেশতা জিবরাঈল এর মাধ্যমে প্রথম ঐশ্বরিক বাণী (ওহী) লাভ করেন।[১৯৬] ফেরেশতা তার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, "পড়ো!" কিন্তু মুহাম্মাদ নিরক্ষরতা স্বীকার করে বললেন যে তিনি পড়তে জানেন না। এরপর জিবরাঈল মুহাম্মাদের আরও কাছে এসে তার কথাটি পুনরাবৃত্তি করেন; মুহাম্মাদও পুনরায় বললেন যে তিনি পড়তে জানেন না। এই ঘটনাটি আরও একবার ঘটে। অবশেষে জিবরাঈল নিজেই আয়াতগুলো পড়ে শোনান এবং মুহাম্মাদ সেগুলো মুখস্থ করতে সক্ষম হন।[১৯৭][১৯৮] জিবরাঈল যে আয়াতগুলো পড়ে শুনিয়েছিলেন, সেগুলো পরবর্তীতে কুরআনের ৯৬তম সূরা "সূরা আলাক্ব" এর প্রথম পাঁচটি আয়াতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ৬১০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর পূর্বাবধি মুহাম্মাদ যে ঐশ্বরিক বাণীগুলো (ওহী) লাভ করেছিলেন, সেগুলোই কুরআনের সকল সূরা ও আয়াত গঠন করে। ইসলামে বিশ্বাস, ইবাদতশরিয়তনীতিশাস্ত্রতাসাউফের মতো অনুশীলন ও বিষয়গুলোর ভিত্তি হিসেবে কুরআনকে ব্যবহার করা হয়।[৯৬][৯৭][১৪৭][১৪৮][১৫৩][১৯৯]

প্রথম ঐশ্বরিক বাণীর পর, মুহাম্মাদ এক দীর্ঘ সময় ধরে কোন নতুন বাণী লাভ করেননি। এই সময়কালকে ফাতরাতুল ওহী (ওহী বন্ধ) বলা হয়। এই সময়ে তিনি ধ্যান, প্রার্থনা এবং উপাসনায় মনোনিবেশ করেন। তবে, এই বিরতি তাকে উদ্বিগ্ন ও ভীত করে তোলে।[২০৫] এই অবস্থার কারণে তিনি ব্যাপকভাবে দুঃখিত ও হতাশ বোধ করেন। কিন্তু কিছুদিন পরে, যখন ঐশ্বরিক বাণী পুনরায় শুরু হয়, তখন তিনি স্বস্তি পান এবং নির্দ্বিধায় মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান জানানোর নির্দেশ লাভ করেন। এই বিষয়ে কুরআনে বেশ কিছু আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, যেমন:[২০৬][২০৭]

ইসলাম প্রচার, ধর্মগ্রহণ ও প্রতিক্রিয়া

ইসলামী ঐতিহ্য অনুসারে, মুহাম্মাদের আহ্বানে প্রথম সাড়া দেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন তার স্ত্রী খাদিজা, যখন তিনি প্রথম ওহী লাভ করে ঘরে ফিরে আসেন। তারপর তাকে অনুসরণ করেন তার চাচা আবু তালিবের পুত্র আলি, মুক্ত দাস যায়েদ ইবনে হারেসা এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বকর[২০৮] এরপর তিন বছর ধরে মুহাম্মাদ কেবল তার আত্মীয়স্বজন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছেই ইসলামের প্রচার করেন।[২০৯] এরপর, বিশ্বাস অনুসারে, কুরআনে সূরা হিজর এর ৯৪ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি সাফা পাহাড়ে উঠে সমগ্র মক্কার জনগণকে উন্মুক্তভাবে ইসলাম গ্রহণের ও মুসলিম হওয়ার আহ্বান জানান।

কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশিরভাগই নেতিবাচক। এই কারণে প্রথম মুসলিমদেরকে ভারী অপমান ও নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছিল মক্কার অবিশ্বাসীদের কাছ থেকে, যারা মুহাম্মাদের নবুয়ত প্রাপ্তির বিষয়টিকে প্রথমে সন্দেহের চোখে দেখেছিল। শুরুতে, মুহাম্মাদ মক্কার নেতাদের কাছ থেকে তেমন কোনো বিরোধিতার সম্মুখীন হননি। তারা ইসলাম প্রচারের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন।[২১০] কিন্তু কিছুদিন পরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। কারণ মুহাম্ম একত্ববাদী বিশ্বাসের প্রচার মক্কার অভিজাতদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। তারা মনে করেছিল যে এতে তাদের সামাজিক অবস্থান বিপন্ন হতে পারে।[২১১] বিশেষ করে কাবা থেকে মূর্তি সরিয়ে ফেলার বিষয়টি তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়, কারণ এটি ধারণা করা হয়েছিল যে এটি তীর্থকেন্দ্রিক বাণিজ্যকে ব্যাহত করবে এবং বহুঈশ্বরবাদী ও পৌত্তলিক রীতিনীতির অবসান ঘটাবে।[২১২] এই সময়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের অধিকাংশই তাদের ধর্ম গ্রহণের ব্যপারটি গোপন করতে বাধ্য হয়েছিল।


হিজরতের পূর্ববর্তী শেষ বছরগুলো

৬১৯ সালে কুরাইশদের বনু হাশিম গোত্রের উপর আরোপিত বৃহৎ বয়কট সমাপ্ত হয়। বয়কটের অল্প কিছুদিন পর, মুহাম্মাদের চাচা আবু তালিব এবং তার স্ত্রী খাদিজা তিন দিনের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করেন।[২১৬]

উল্লেখিত ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে মুহাম্মাদ আরবের আরেক গুরুত্বপূর্ণ শহর তায়েফ যাত্রা করেন এবং সেখানে একজন গোত্রীয় সুরক্ষাদাতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তায়েফে তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং তাকে আরও বেশি শারীরিক বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। তার পালিত পুত্র যায়েদ ইবনে হারেসার সাথে তাকে পাথর নিক্ষেপ করে ভয়াবহরকমভাবে আহত করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।[২১৯][২২০] অবশেষে মুহাম্মাদ মক্কায় ফিরে যেতে বাধ্য হন। মুহাম্মাদ যখন মক্কায় ফিরছিলেন, তখন তায়েফের ঘটনাবলীর খবর আবু জাহেলের নিকট পৌঁছেছিল। সে বলল, "তারা তাকে তায়েফে প্রবেশ করতে দেয়নি, তাই আমরাও তাকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবো না।" পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে, মুহাম্মাদ একজন চলতি ঘোড়সওয়ারকে তার মায়ের গোত্রের সদস্য আখনাস ইবনে শুরায়কের কাছে বার্তা পৌঁছানোর অনুরোধ করেন। মুহাম্মাদ চেয়েছিলেন আখনাস তাকে নিরাপদে মক্কায় ঢোকার সুরক্ষা দেবেন। কিন্তু আখনাস তা প্রত্যাখ্যান করেন, এই বলে যে তিনি কেবল কুরাইশদের একজন মিত্র। এরপর মুহাম্মাদ সুহাইল ইবনে আমরের কাছে বার্তা প্রেরণ করেন, যিনি গোত্রীয় মর্যাদার কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরিশেষে, মুহাম্মাদ বনু নওফালের প্রধান মুতইম ইবনে আদির কাছে সুরক্ষার অনুরোধ পাঠান। মুতইম সম্মত হন এবং নিজেকে অস্ত্রসজ্জিত করে সকালে তার ছেলে ও ভাইপোদের সাথে মুহাম্মাদকে শহরে নিয়ে আসার জন্য রওনা দেন। আবু জাহেল তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করে যে মুতইম কেবল তাকে সুরক্ষা দিচ্ছেন, নাকি ইতোমধ্যে তিনি তার ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। মুতইম জবাবে বললেন, "অবশ্যই তাকে সুরক্ষা দিচ্ছি।" এরপর আবু জাহেল বলল, "তুমি যাকে রক্ষা করবে, আমরাও তাকে রক্ষা করব।" এভাবে মুহাম্মাদ নিরাপদে তার নিজ শহরে পুনঃপ্রবেশ করতে সক্ষম হন।[২২১]

আকাবার শপথ

আরব উপদ্বীপের বহু মানুষ এই নতুন ধর্ম ও এর নবী সম্পর্কে শুনেছিল এবং ব্যবসা বা কাবায় তীর্থের মতো কারণে মক্কা ভ্রমণ করতে আসত। প্রথমবার মক্কায় আসা প্রায় ১২ জন (আকাবার প্রথম শপথ) এবং এরপর আবার মক্কায় আসা প্রায় ৩০০ জন (আকাবার দ্বিতীয় শপথ); ৬২০-৬২১ সালে 'আকাবা' নামক স্থানে, যা মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে, মুহাম্মাদ এর সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করে তাকে ইসলাম গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে ইয়াসরিবে (যা পরবর্তীতে মদিনা নামে পরিচিত) আমন্ত্রণ জানায়।[২২২] মুহাম্মাদ এই সুযোগটি নিজে এবং তার অনুসারীদের জন্য নতুন আশ্রয় খুঁজে পেতে ব্যবহার করেন। ইয়াসরিবের (মদিনা) আরব জনগোষ্ঠী এক ঈশ্বরে বিশ্বাসের সাথে পরিচিত ছিল, কারণ শহরে একটি ইহুদি সম্প্রদায় ছিল।[২২৩] 


মদিনায় হিজরত

মক্কার কুরাইশরা যখন দেখতে পেল যে তারা মুহাম্মাদকে তার একঈশ্বরবাদী প্রচারণা থেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং মদিনায় অবস্থিত মুসলমানরা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তখন তারা আশঙ্কা করতে শুরু করল যে এই পরিস্থিতি তাদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এই উদ্বেগের ভিত্তিতে তারা "দারুন-নদওয়া" নামক একটি সভায় মিলিত হয় এবং এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে।[২২৮] আলোচনায় তারা উল্লেখ করে যে ইসলাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী পৌত্তলিক রীতিনীতি ও ব্যবস্থার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। সর্বোপরি, তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে মুহাম্মাদকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে। এই কাজের জন্য বিভিন্ন গোত্র থেকে কয়েকজন শক্তিশালী তরুণ যুবককে নির্বাচিত করা হয়।মুহাম্মাদ সেই রাতে যখন মক্কার কুরাইশদের হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার খবর পেলেন, তখন তিনি তার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আলি তখন মুহাম্মাদ এর পোশাক পরে তার বিছানায় শুয়ে পড়েন। এতে করে হত্যাকারীরা ভেবেছিল যে মুহাম্মাদ এখনও ঘরেই আছেন।[২২৯] কিন্তু যখন হত্যাকারীরা সত্যিটা জানতে পারল, তখন মুহাম্মাদ ইতিমধ্যেই আবু বকর এর সাথে মক্কা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ এর চাচাতো ভাই আলি এই ষড়যন্ত্র থেকে জীবিত রক্ষা পান। তবে মুহাম্মাদ এর নির্দেশাবলী পালন করার জন্য তিনি কিছুদিনের জন্য মক্কায় অবস্থান করেন।[২৩০] পরে আলি তার মা ফাতিমা বিনতে আসাদ, মুহাম্মাদ এর কন্যারা, স্ত্রী সাওদা বিনতে জামআ, ধাত্রী উম্মে আইমান এবং বিভিন্ন কারণে পিছিয়ে পড়া অন্যান্য মুসলমানদের সাথে যাত্রা শুরু করেন।[২৩০]


মদিনার জীবন
৬২২ সালে মুহাম্মাদ যখন মদিনায় পৌঁছান, তখন স্থানীয় মুসলমানরা তাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়। প্রত্যেক মুসলিম তাকে নিজ বাড়িতে অতিথি হিসেবে রাখতে চেয়েছিল। অবশেষে, তার উট যেখানে বসে পড়ে, সেই স্থানের কাছেই বসবাসকারী আবু আইয়ুব আনসারি-এর বাড়িতে তিনি অবস্থান করেন।[২৩২] মুহাম্মাদ মদিনায় একটি মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন এবং তার পরিবারের জন্য মসজিদের পাশে ঘর তৈরি করেন। মসজিদের এক পাশে বেঘরদের থাকার জন্য "সুফফাহ" নামে একটি স্থান তৈরি করা হয়। এখানে থাকা ব্যক্তিদের "আসহাবুস সুফফাহ" বলা হত। পরবর্তীতে "মসজিদে নববী" নামে পরিচিত এই মসজিদটি মুহাম্মাদের মদিনার সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এটি পরবর্তী যুগে নির্মিত মসজিদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে ওঠে।[২৩৩]

মদিনার সনদ এবং মদিনা শহর রাষ্ট্র


মদিনার সনদ, ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদ কর্তৃক প্রণীত একটি ঐতিহাসিক দলিল যা মদিনার বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করে। এর ২৫নং ধারাটি বেশ আকর্ষণীয়, কারণ এতে ইহুদি গোষ্ঠীগুলোকে "উম্মাহ"-এর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং উভয় সম্প্রদায়ের জন্য নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।[২৩৬] ওয়াশবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এল. আলি খান এই দলিলকে একটি "সামাজিক চুক্তি" হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা একটি "সনদের" উপর ভিত্তি করে তৈরি। খানের মতে, এই দলিলটি "এক ঈশ্বরের আধিপত্যের অধীনে বসবাসকারী বিভিন্ন গোষ্ঠী দ্বারা গঠিত একক সম্প্রদায়ের ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।"[২৩৭] মদিনার সংবিধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুসলমানদের মধ্যকার সম্পর্কের পুনর্নির্ধারণ। এই দলিলের মাধ্যমে মুসলমানরা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে তাদের বিশ্বাসকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে।[২৩৮] গোষ্ঠী পরিচয় বিভিন্ন গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করার জন্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে নতুন করে গঠিত "উম্মাহ"-এর জন্য প্রধান সংযোগকারী শক্তি ছিল "ধর্ম"।[২৩৯]

মদিনার সংবিধান, যা মিসাক-ই-মদিনা নামেও পরিচিত, ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি ৬২২ সালে মুহাম্মাদ কর্তৃক প্রণীত হয়েছিল এবং মদিনার বিভিন্ন ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য নীতি নির্ধারণ করে। এই সংবিধানে অমুসলিমদের অধিকার বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ধর্মীয় সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মদিনার সংবিধান অনুসারে মদিনায় বসবাসকারী অমুসলিমদের নিম্নলিখিত অধিকার ছিল:[২৪১]

  • ধর্মীয় স্বাধীনতা:

অমুসলিমদের তাদের নিজস্ব ধর্ম পালন করার পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন, ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ ও সংরক্ষণ এবং ধর্মীয় নেতা নির্বাচনের অধিকার ছিল। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য তাদের কখনোই হয়রানি করা হত না।

  • রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা:

মদিনার রাষ্ট্র অমুসলিমদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিত। বাইরের আক্রমণ থেকে মদিনা রক্ষা করার জন্য অমুসলিমদেরও সাহায্য করতে হত।

  • রাজনৈতিক অধিকার:

অমুসলিমদের মদিনার রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণের অধিকার ছিল। তাদের নিজস্ব বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন করার অধিকার ছিল। মুসলিমদের সাথে তাদের সমান অধিকার ছিল।

  • অর্থনৈতিক অধিকার:

অমুসলিমদের তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। তাদের সম্পত্তির মালিকানা ও উত্তরাধিকারের অধিকার ছিল। মুসলিমদের সাথে তাদের সমান অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ছিল।

  • সামাজিক অধিকার:

অমুসলিমদের মদিনার সমাজে সম্মানের সাথে বসবাস করার অধিকার ছিল। তাদের মুসলিমদের সাথে সমান সামাজিক ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার ছিল।

সশস্ত্র সংঘাতের সূচনা: বদর যুদ্ধ

বদরের যুদ্ধ হিজরতের দ্বিতীয় বছরের রমজান মাসের ১৭ তারিখে (১৭ মার্চ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) সংঘটিত হয়েছিল। যুদ্ধের পূর্বে ৬২৩ থেকে ৬২৪ সালের মধ্যে মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে বেশ কিছু খন্ডযুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধের কারণ ছিল মক্কার কুরাইশদের মুসলমানদের উপর নির্যাতন এবং মুসলিমদের একটি বাণিজ্য কাফেলা আটক করার চেষ্টা। যুদ্ধের শুরুতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১০ জন, কিন্তু মক্কার কুরাইশদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৯৫০ জন। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মুসলমানরা কঠিন প্রতিরোধ করে। কুরাইশদের সেনাপতি আবু জাহেল যখন নিহত হন, তখন তারা পালিয়ে যেতে শুরু করে। কয়েক ঘন্টা স্থায়ী এই যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী হয়। কিছু আধুনিক ইতিহাসবিদ, যেমন রিচার্ড এ. গ্যাব্রিয়েল, মনে করেন মুহাম্মাদের কৌশলগত সামরিক কৌশল এবং মুসলমানদের সাহসই এই বিজয়ের মূল কারণ।[২৫০] অন্যদিকে, কুরআনের কিছু আয়াত এবং পরবর্তীকালের কিছু বর্ণনা অনুসারে, যুদ্ধের সময় মুসলমানদের সাহায্য করার জন্য হাজার হাজার ফেরেশতা পাঠানো হয়েছিল।[২৫১]

উহুদের যুদ্ধ

মক্কার সৈন্যবাহিনী, ৬২৫ সালের ১১ মার্চ মক্কা থেকে মদিনার দিকে যাত্রা শুরু করে। এই আক্রমণে মক্কাবাসীর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল গত বছর সংঘটিত বদর যুদ্ধে তাদের ক্ষয়ক্ষতির প্রতিশোধ নেওয়া এবং মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে দমন করা।  

উহুদ পর্বতের পাদদেশে দুই পক্ষের বাহিনী মুখোমুখি হয়।[২৫৫] যুদ্ধের শুরুতে মুসলিমদের জোরালো আক্রমণের মুখে মক্কার বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। এই দৃশ্য দেখে, মুসলিম বাহিনীর ধনুর্ধররা ভেবে নেয় যে যুদ্ধ শেষ হয়েছে এবং তারা তাদের অবস্থান ত্যাগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে ফেলে যাওয়া মক্কার বাহিনীর সম্পদ সংগ্রহ করতে শুরু করে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে খালিদ বিন ওয়ালিদ তার বাহিনী নিয়ে ধনুর্ধরদের ফাঁকা অবস্থান দিয়ে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করে।[২৫৫] এই আক্রমণে মুসলিম বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং পিছু হটতে শুরু করে। পিছু হটতে থাকা মক্কার বাহিনী এই সুযোগে যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে এসে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করে। মুসলিম বাহিনী উহুদ পর্বতের দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। পর্বতে আশ্রয় নেওয়া মুসলিম বাহিনী তীরন্দাজদের সাহায্যে মক্কার বাহিনীকে পিছু হটাতে সক্ষম হয়। মক্কার বাহিনীও নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করতে ব্যর্থ হয় এবং যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে।[২৫৫]

উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর ৭০ জন সৈনিক শহীদ হয় এবং মক্কার বাহিনীর ৪৪-৪৫ জন সৈনিক নিহত হয়।[২৫৪] এই যুদ্ধে মুহাম্মাদ গুরুতর আহত হন এবং তার চাচা হামযা সহ আরও অনেক মুসলিম শহীদ হন। মক্কার বাহিনীর নেতা আবু সুফিয়ান এই যুদ্ধকে বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে ঘোষণা করে।[২৫৩]

খন্দক যুদ্ধ

৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ শে মার্চ, ১০,০০০ সৈন্য এবং ৬০০ অশ্বারোহী নিয়ে মদিনা আক্রমণ করতে আসে মক্কার বাহিনী।[২৫৬][২৫৭][২৫৮] মুহাম্মাদের নেতৃত্বে ৩০০০ পদাতিক সৈন্য নিয়ে মদিনাবাসী শহরে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সালমান আল-ফারসির পরামর্শ অনুযায়ী শহরের কিছু কৌশলগত স্থানে খন্দক (পরিখা) খনন করা হয়, যার ফলে এই যুদ্ধ খন্দকের যুদ্ধ নামে পরিচিতি লাভ করে। এক মাস ধরে চলা এই অবরোধ শেষ পর্যন্ত ঠান্ডা আবহাওয়া এবং ঝড়ের কারণে প্রত্যাহার করা হয়, যা মদিনাবাসীর বিজয় হিসেবে চিহ্নিত হয়।[২৫৯][২৬০]

হুদাইবিয়ার সন্ধি

হুদাইবিয়ার সন্ধি (৬২৮ খ্রিস্টাব্দ) সম্পন্ন হওয়ার পর, মুহাম্মাদ আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে বিভিন্ন দেশ ও রাষ্ট্রের শাসকদের কাছে ইসলামে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠান। এই চিঠিগুলো ছিল ইসলামের বাণী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই বিষয়ে কুরআনে বেশ কিছু আয়াত রয়েছে। যেমন:

সমাধি
হযরত মুহাম্মাদকে যেখানে তার মৃত্যু হয়েছিল, তার স্ত্রী আয়েশার ঘরেই তাঁকে দাফন করা হয়।[২৯৩][২৯৪] উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ প্রথমের শাসনামলে মসজিদে নববী সম্প্রসারণ করা হয় এবং মুহাম্মাদের সমাধি (রওজা মোবারক) স্থানটিকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।[২৯৫] ত্রয়োদশ শতকে মামলুক সুলতান মনসুর কালাউন নবী মুহাম্মাদের সমাধির উপর সবুজ গম্বুজটি নির্মাণ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ষোড়শ শতকে উসমানীয় সুলতান সুলতান সুলাইমান গম্বুজটির রঙ সবুজে পরিবর্তন করেন।[২৯৬] নবী মুহাম্মাদ এর কবরের ঠিক পাশে তার সাহাবী এবং প্রথম দুই খলিফা আবু বকর ও উমর ইবনুল খাত্তাব-কে দাফন করা হয়েছে।[২৯৩][২৯৭][২৯৮]

১৮০৫ সালে সৌদ বিন আবদুল-আজিজ মদিনা দখল করলে মুহাম্মাদের সমাধি থেকে সোনা ও রত্ন খচিত সাজসজ্জা সরিয়ে ফেলা হয়।[২৯৯] সৌদের অনুসারী ওয়াহাবিরা মদিনার প্রায় সকল গম্বুজ ভেঙ্গে দেয় (মুহাম্মাদের সমাধি গম্বুজ ব্যতীত) যাতে মানুষ সেগুলোর পূজা না করে।[২৯৯] সেই হামলায় নিছক ভাগ্যের জোরে নবী মুহাম্মাদ এর রওজা মোবারক রক্ষা পায়।[৩০০] ১৯২৫ সালে আবার যখন সৌদি মিলিশিয়ারা মদিনা পুনর্দখল করে, তখন তারা শহরটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়।[৩০১] ওয়াহাবি ইসলামি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কবর চিহ্নিত না করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার রীতি রয়েছে।[৩০০] যদিও সৌদিরা এই রীতিটি অনুসরণ করে না, কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক হাজী এই রীতি পালন করতে মদিনায় আসে এবং অনেক হাজী এখনও সমাধিতে আয়াত পাঠ করতে থাকেন।[৩০২]

অলৌকিকত্ব

ইসলামী তথ্যসূত্র অনুসারে, মুহাম্মাদের জন্মের পূর্বে সূর্যোদয়ের আগে কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল: কা'বার বড় বড় মূর্তি নিজে থেকেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল; সাসানি সাম্রাজ্যের শাসক প্রথম খসরু পারস্যের রাজধানীতে অবস্থিত তার প্রাসাদের স্তম্ভগুলো ভেঙে পড়েছিল; হাজার বছর ধরে জ্বলন্ত জরাথুস্ট্রীয়দের পবিত্র আগুন নিভে গিয়েছিল; পারস্যের অগ্নিপূজারীদের পবিত্র মনে করা সাওয়া সরোবর মাটিতে ধসে গিয়েছিল; শতাব্দী ধরে শুকনো সেমাওয়া সরোবর পানিতে ভরে উঠেছিল; সেই রাতে আকাশে একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র উদিত হয়েছিল, এমনকি কিছু ইহুদি পণ্ডিত এই নক্ষত্রের মাধ্যমে মুহাম্মাদের জন্মের সংবাদ পেয়েছিলেন।[৩০৫][৩০৬]

চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা

চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার মুজিজা হলো ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি বিশ্বাস, যা মুহাম্মাদের প্রদর্শিত অন্যতম মহান মুজিজা হিসেবে বিবেচিত। কুরআনের সূরা ক্বামার-এর প্রথম আয়াত এবং সংশ্লিষ্ট হাদিসসমূহের ভিত্তিতে এই বিশ্বাস প্রচলিত। কুরআনে বলা হয়েছে, "ক্বিয়ামত আসন্ন। চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।" (সূরা কামার, আয়াত ১)[৩০৭] অনেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাম্মাদ একবার একদল মক্কাবাসীর কাছে চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করে দেখান।[৩০৮] তিনি তার আঙুল দিয়ে ইশারা করলে চাঁদ দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার চাঁদ একত্রিত হয়ে যায়।[৩০৯]

ইসরা ও মিরাজের ঘটনা

মুহাম্মাদেরহিজরতের দেড় বছর আগে ইসরা ও মিরাজের ঘটনা ঘটে বলে মনে করা হয়।[৩১৪] মুসলিমরা সাধারণত ইসরা কে মক্কা থেকে জেরুসালেম পর্যন্ত মুহাম্মাদের ভ্রমণ এবং মেরাজকে জেরুসালেম থেকে সপ্ত আসমান পর্যন্ত তার উর্ধ্বারোহণ হিসেবে বিশ্বাস করেন। এই ঘটনা অনুসারে, এক রাতে মুহাম্মাদ জিবরাঈল-এর সঙ্গে বোরাক নামক এক বাহনে চড়ে মসজিদুল আকসায় যান। সেখানে তিনি ইব্রাহিমমুসাঈসা এবং অন্যান্য নবীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহা (সপ্তম আসমানের সর্বোচ্চ স্তর) পর্যন্ত আরোহণ করেন। সেখানে তিনি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন, জান্নাত ও জাহান্নাম অবলোকন করেন এবং তারপর নিজগৃহে ফিরে আসেন। সুন্নি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ভ্রমণের সময়, অন্যান্য বিধানের পাশাপাশি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও মুসলমানদের জন্য ফরজ করা হয়েছিল। সুন্নি বিশ্বাস অনুযায়ী, মুহাম্মাদ এই ভ্রমণটি শরীর ও রুহ দিয়ে করেছিলেন। অন্যদিকে, শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী এই ভ্রমণ নবী মুহাম্মাদ শুধুমাত্র রুহ দিয়ে করেছিলেন।[৩১৫]

এক আয়াত মেরাজের ঘটনার বর্ণনা করে, যেখানে মুহাম্মাদকে এক রাতে মক্কার কাবা ঘর থেকে জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই অলৌকিক ভ্রমণে, তিনি আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন দেখেছিলেন।[৩১৮]

মেরাজের বিবরণ হাদিস এবং সীরাতের বইগুলোতে পাওয়া যায়। বলা হয়েছে যে, মুহাম্মাদ ঘুমিয়ে ছিলেন এবং ফেরেশতা জিবরাঈল তাকে বোরাক নামক একটি উড়ন্ত জীবের উপরে করে আল-আকসা মসজিদে নিয়ে যান। সেখানে তিনি অনেক নবী-রাসুলের সাথে সালাত আদায় করেন। এরপর তাকে জান্নাতজাহান্নাম এবং সিদরাতুল মুনতাহা দেখানো হয়। সিদরাতুল মুনতাহা হলো সপ্তম আকাশে একটি গাছ, যেখানে সৃষ্টির জ্ঞানের সীমা শেষ হয়।

ইসলামী ঐতিহ্যে মুহাম্মাদের স্থান

আল্লাহর একত্ববাদ (ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়) প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পর, মুহাম্মাদের নবুয়তের প্রতি বিশ্বাস ইসলামের মূল ভিত্তি। প্রত্যেক মুসলিম শাহাদত পাঠে ঘোষণা করে: "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল" শাহাদত হলো ইসলামের মূল বিশ্বাস বা নীতি। ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে, একজন নবজাতকের কানে শাহাদতই প্রথম পাঠ করা উচিত; শিশুদেরকে শাহাদত শেখানো হয় এবং মৃত্যুর সময় শাহাদত পাঠ করা হয়। মুসলিমরা নামাজের আহ্বানে (আযান) এবং নামাজে শাহাদত পুনরাবৃত্তি করে। ইসলামে ধর্মান্তরিত হতে ইচ্ছুক অমুসলিমদেরকেও এই শাহাদত পাঠ করেই ইসলামে প্রবেশ করতে হয়।[৩৮৪]

ঘটনাপঞ্জি

মক্কার বছর[৪২৮][৪২৯][৪৩০][৪৩১]মদিনার বছর[৪২৮][৪২৯][৪৩০][৪৩১]
বছরবয়সঘটনাবছরবয়সঘটনা
আনু. ৫৭০-পিতা আবদুল্লাহর মৃত্যু৬২২৫২মদিনায় আগমন এবং মসজিদে নববীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
আনু. ৫৭০-হস্তিবর্ষমদিনায় মদিনার সনদ নামে সংবিধান প্রণয়ন
আনু. ৫৭০-মক্কা নগরীতে তার জন্মসাসানীয় সাম্রাজ্যের দখলকৃত সিরিয়া ও মিশর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য কর্তৃক পুনর্দখল
৫৭৪দুধমা হালিমার নিকট হতে পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তন৬২২-৬২৩৫২-৫৩মুহাজির এবং আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন
৫৭৬মাতা আমিনার মৃত্যু৬২৩৫৩মদিনা নগর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নির্বাচন
৫৭৮দাদা আবদুল মুত্তালিব-এর মৃত্যুমসজিদ আল-আকসা (জেরুজালেম) থেকে কাবায় (মক্কা) মুসলমানদের কিবলা পরিবর্তন
আনু. ৫৮৩১২-১৩চাচা আবু তালিব-এর সাথে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে সিরিয়া গমন৬২৪৫৪বদরের যুদ্ধ
৫৮৭১৭চাচা যুবায়ের-এর সাথে ইয়েমেন গমন৬২৪কন্যা রুকাইয়াহর মৃত্যু
৫৮৮১৮চাচাদের সাথে ফিজার যুদ্ধে অংশগ্রহণ৬২৪বাগদত্তা আয়িশার সাথে তার বিবাহ
৫৯০২০হিলফুল ফুজুল সামাজিক সংঘ গঠন৬২৪মদিনায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইহুদীদের বিরোধীতা ও ষড়যন্ত্রের সূচনা
৫৯৪২৪খাদিজার ব্যবসায়িক প্রতিনিধি হিসেবে বুসরা গমন৬২৪বনু কাইনুকা অভিযান
৫৯৫২৫খাদিজার সাথে সাক্ষাৎ, খাদিজার বৈবাহিক প্রস্তাব এবং বিবাহ৬২৫৫৫বদরের যুদ্ধ এবং চাচা হামযার মৃত্যু
৫৯৮২৭-২৮তার প্রথম সন্তান কাসিমের জন্ম, পিতা হিসেবে আবুল কাসিম (কাসিমের পিতা) উপাধি লাভ এবং শিশুবয়সেই প্রথম সন্তানের মৃত্যুনাতি হাসান ইবনে আলীর জন্ম
৫৯৯২৮-২৯প্রথম কন্যাসন্তান জয়নবের জন্মরেসি'র ঘটনা এবং বিয়ার-ই মাউনে'র দুর্ঘটনা।
৬০২৩২কন্যাসন্তান রুকাইয়াহর জন্মবনু নাদির অভিযান
৬০৫৩৫কাবা ঘরের পুনর্নির্মাণের সময় হাজরে আসওয়াদ পাথরটির স্থাপন বিষয়ে বিরোধের মীমাংসায় মধ্যস্থতা করা৬২৬৫৬দ্বিতীয় নাতি হোসাইন ইবনে আলীর জন্ম
আনু. ৬০৭৩৭কন্যাসন্তান উম্মে কুলসুমের জন্ম৬২৭৫৭খন্দকের যুদ্ধ
আনু. ৬০৯৩৯কনিষ্ঠ কন্যা ফাতিমার জন্মখন্দকের যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ইহুদী গোত্র বনু কুরাইজার শাস্তি
৬১০৪০হেরা গুহায় অবস্থানকালে প্রথম ওহি প্রাপ্তি৬২৮৫৮হুদাইবিয়ার সন্ধি
৬১১৪১দ্বিতীয় পুত্রসন্তান আব্দুল্লাহর জন্ম এবং এক বছর বয়স হওয়ার আগেই তার মৃত্যুইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি লিখে রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যের শাসকদের কাছে পত্র প্রেরণ
৬১৩৪৩প্রকাশ্যে মক্কাবাসীর নিকট আল্লাহর একত্ববাদের প্রচারখায়বারের যুদ্ধ
৬১৪৪৪-৪৫মক্কায় মুসলিমদের উপর তীব্র নিপীড়নের সূচনাখায়বার বিজয়ের পর একজন ইহুদি মহিলা কর্তৃক বিষ প্রয়োগের চেষ্টা
৬১৫৪৫আবিসিনিয়ায় একদল মুসলিমের অভিবাসননিনেভের যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে বাইজেন্টাইন-সাসানিদের যুদ্ধের সমাপ্তি
৬১৬৪৬হামযা এবং উমরের ইসলাম গ্রহণ৬২৯৫৯কন্যা জয়নবের মৃত্যু
সাসানীয় সাম্রাজ্যের শাসক দ্বিতীয় খসরুর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সিরিয়া এবং মিশর দখলখালিদ বিন ওয়ালিদ এবং আমর ইবনুল আস-এর ইসলাম গ্রহণ
বনু হাশিম গোত্রের বিরুদ্ধে অবরোধের সূচনামুতার যুদ্ধ (বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে প্রথম যুদ্ধ)
৬১৯৪৯বনু হাশিম গোত্রের বিরুদ্ধে অবরোধের সমাপ্তি৬৩০৬০মক্কা বিজয়কাবা থেকে সকল মূর্তির অপসারণ
স্ত্রী খাদিজা এবং চাচা আবু তালিবের মৃত্যু (দুঃখের বছর)আরবে ব্যাপক অভিযান এবং ইসলামের দ্রুত প্রসার
৬২০৫০ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তায়েফ গমন, তার উপর তায়েফবাসীর নিপীড়ন ও পাথর নিক্ষেপ এবং মক্কায় পুনরায় ফিরে আসাকন্যা উম্মে কুলসুমের মৃত্যু
ইসরা ও মিরাজের ঘটনাস্ত্রী মারিয়া থেকে পুত্র ইব্রাহিমের জন্ম এবং ১-২ বছর বয়সে তার মৃত্যু
আকাবার প্রথম শপথতাবুকের যুদ্ধ
আনু. ৬২১৫১সাওদা বিনতে জামআর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধআনু. ৬২৮-৬৩১৫৮-৬১দাহিয়া কালবীর মাধ্যমে বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের কাছে ইসলামের আমন্ত্রণ পত্র প্রেরণ
৬২১৫১আকাবার দ্বিতীয় শপথ৬৩২৬১-৬২মক্কায় বিদায় হজ্জ পালন এবং এরপর এক লক্ষেরও অধিক মুসলমানের কাছে বিদায় হজ্জের ভাষণে শেষবারের মতো সকলের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদান
৬২২৫২মদিনায় হিজরত৬২-৬৩শারীরিক অসুস্থতা এবং মদিনায় শাহাদৎবরণ



No comments

Powered by Blogger.